You are currently viewing Telkupi – অতীতের বন্দরনগরী তেলকুপি

Telkupi – অতীতের বন্দরনগরী তেলকুপি

অবস্থান: দামোদর গর্ভে নিমজ্জিত অতীতের বন্দরনগরী  Telkupi তথা মন্দির নদীর দক্ষিণ তীরে জে এল নং ৬৯ রঘুনাথপুর এ অবস্থিত তেলকুপি।

তেলকুপির  ইতিহাস:

পুরুলিয়ার পর্যটন মানচিত্রে তেলকুপি Telkupi এর উৎপত্তিস্থল হলো তৈলকম্প।

এই শব্দ থেকে এর উৎপত্তি তা জানা যায় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুযায়ী এক প্রকার কর হলো তৈল এবং কম এর অর্থ হল পরগনা কম্প শব্দটি এসেছে তামিল কম্পন শব্দ থেকে। সুতরাং অনুমান করা যায় যে অধুনা তেলকুপি ছিল এককালে কর প্রদানকারী সমান্ত রাজ্য।

তরুণদেব ভট্টাচার্যের মতে ত্রিলিঙ্গ বা তৈলঙ্গ দের এই কর প্রদান করা হতো তবে এ বিষয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মতভেদ দেখা যায় তৈলকম্প এর উল্লেখ পাওয়া যায় প্রথমেই সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত রামচরিত কাব্য গ্রন্থে সেখানে বলা হয়েছে– “শিখর ইতি পরিসর বিসরদির রাজ রাজি গণ্ড গর্ব্বগহল দহন দাবানল কম্পিয় কল্পতরু রুদ্রশিখর”।

অর্থ টি কে বাংলায় অনুবাদ করলে হয়: যুদ্ধে যে নৃপতি প্রভাব নদী, পর্বত ও উপান্তভূমি জুড়ে বিস্তীর্ণ। পর্বত কোন্দরের রাজন্যবর্গের যিনি দর্প হরণকারী দাবানলের মত তিনি তৈলকম্পের কল্পতরু রুদ্রশিখর।

সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতম’ কাব্যর রচনার সময়কাল ১০৭০ থেকে ১১২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। কাব্যটির বিষয়বস্তু রাম পাত্রের কীর্তিকাহিনীর বিবৃতি। কবি এমন ভাবে তা বর্ণনা করেছেন যেখানে একদিকে অযোধ্যার রাজা রামচন্দ্র এর ও অন্যদিকে পাল সম্রাট রামপালের কীর্তিকাহিনী একই শ্লোকে সুন্দর ভাবে উঠে এসেছে।

রামচরিতম কাব্য এর বর্ণিত রাজা রুদ্র শিখর যে তৈলকম্পর রাজা ছিলেন তা বেড়ামে প্রাপ্ত একটি লিপি থেকে প্রমাণিত হয়। মগধ ও রাঢ়ে পাল সাম্রাজ্যের অধিপত্য বিস্তৃত হয়েছিল। পিতৃরাজ্য উদ্ধারের সময় রাজা রুদ্রশিখর রামপালকে সহযোগিতা করেছিলেন।

অতীতে তৈলকম্প রাজ্যটি দামোদরের দক্ষিণ তীরে কসাই এর উত্তর পর্যন্ত হয়ে পশ্চিমে ঝালদা থেকে দক্ষিনে বুধপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এবং বুধপুর পর্যন্ত যে সীমানা নির্দেশিত হয়েছিল তা নিচের লিপি থেকে প্রমাণিত হয়। যেখানে বলা হয়েছে: ‘বাঢ়ম বারম পঞ্চদ্রিশ্বর সীমা জীব ধ যে না বা রাস আয়। অর্থাৎ  রার বেষ্টনী ঘেরা পঞ্চদ্রিশ্বর এর সীমা কেউ যেন খর্ব না করে’।

অতীত এর মন্দির রাজি:

বর্তমানে তেলকুপি  Telkupi  এক বিলুপ্ত ইতিহাসের সাক্ষী অথচ ১৮৭২ সালে যখন J.D Beglar(জে ডি বেগলার) এখানে মন্দির পরিদর্শনে আসেন তখন তিনি ২২ টি দেব দেউল দেখতে পান। তার রচিত ‘Report of a tour through the Bengal Provinces’ নামক জার্নালে সেই ২২ টি দেউল এর বিস্তারিত তথ্য আছে।

যেটা প্রকাশিত হয় ১৮৭৮সালে। আবার ১৯৬৯সালে প্রকাশিত ডক্টর দেবলা মিত্র এর লেখা ‘Telkupi-a Submerged temple site in West Bengal’ গ্রন্থ থেকে আমরা খুঁজে পাই ২৬টি দেব দেউলের প্রসঙ্গ।

আনুমানিক খ্রিস্টীয় দশম থেকে একাদশ শতাব্দীতে তেলকুপিতে এই সব দেব দেউল প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত জৈন ব্যবসায়ীদের এইসব দেব দেউল নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁরা ছিলেন তাম্র ব্যবসায়ী। সেকালের এই অঞ্চলের দুটি বিখ্যাত খনি ছিল তামাজুড়ি ও তামাখুন।

আরো পড়ুন – Deul (দেউল) in Chaliyama – A Beautiful Architecture In Purulia

এই  তাম্র আকরিক, সেইসঙ্গে নানান তৈলবীজ রেশম, পশম, নৌকা বোঝাই হয়ে দামোদরের ওপর দিয়ে পৌঁছে যেত তাম্রলিপ্ত বন্দরে। এই জলপথেও ছাড়াও আরো এক বিখ্যাত সড়কপথে এই পণ্য আদান-প্রদান চলত।

পথটি ছিল মেদিনীপুর জেলার তমলুক থেকে ক্রমশ উত্তর দিকে রূপনারায়ন নদের পশ্চিম তীর বরাবর ঘাটাল মহকুমার ফেপুরপুর, দাসপুর, পান্না, ঘাটাল হয়ে শিলাবতী নদী অতিক্রম করে, শিলাবতী কে কখনো দক্ষিণে কখনো বামে রেখে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর, ছাতনা, শুশুনিয়া হয়ে পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর ও তেলকুপির উপর দিয়ে।

এইসব জৈন ব্যবসায়ীদের অর্থানুকুল্যে এখানে গড়ে ওঠে অজস্র দেব দেউল। পরবর্তীকালে তাদের ব্যবসায় ভাটা পড়লে দেউলী পরিত্যক্ত হয় এবং ব্রাহ্মণ প্রভাবে সূর্য,গণেশ, শিব, নৃসিংহ, বিষ্ণু, ও প্রভৃতি মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়।

বর্তমানে দর্শনীয় বিষয় Telkupi :

বর্তমানে এখানে গেলে চোখে পড়বে দুটি প্রস্তর নির্মিত দেউল হাড় জিরজিরে অবস্থায় অতীতকে সাক্ষী দিতে কোনরকমে দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো দিন ভেঙে লুটিয়ে পড়বে মাটিতে। আরেকটি রয়েছে নদীর মাঝে কোন কোন বছর বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে গেলে তা দেখা যায়।

তাছাড়া দেখা যাবে তেলকুপি  Telkupi  থেকে প্রাপ্ত পাথর বাড়ি গ্রামে নীলকন্ঠ বাসিনীর মূর্তি, রক্ষিত ঝষভ দেব, দুটি দ্বারপত্র, বিষ্ণু মূর্তি পাশের  গ্রাম জয়পুরে আছে মাতা ত্রিশালা, মহাবীর, গণেশ মূর্তি, লালপুরে আছে দেবী অম্বিকার মূর্তি। তাছাড়া দুটি ভগ্ন জৈন তীর্থঙ্করের খন্ডিত মূর্তি।

নদীর ওপারে খাড়া পাথর গ্রামে দেখতে পাবেন  ঝষভনাথ, বিমল নাথ, অম্বিকা, ভগ্ন যক্ষ দের মূর্তি। তাছাড়া শিবপুরে আছে পীড়া শৈলীর দেউল, তীর্থঙ্কর মূর্তি ময়ূর পৃষ্ঠে অরুড়া দেবি এবং  জৈন গণেশ মূর্তি এবং বৃহত্তর খোদাই করা বৃষ।

কিভাবে যাবেন Telkupi  :

পুরুলিয়া টাউন থেকে দূরত্ব ৫০ কিমি। গাড়ি রিজার্ভ করে বা চেলিয়ামা বসে এসে গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন। ট্রেনে এলে আদ্রায় নেমে অটো বা গাড়ি ভাড়া করে খুন সহজেই বহলে আসতে পারেন।

কোথায় থাকবেন:

এবার যদি রাতে থেকে যেতে চান তাহলেও আছে এর সুব্যবস্থা। পুরুলিয়া রয়েছে বহু হোটেল ও লজ। এ ছাড়াও চেলিয়ামার মানভূম লোক সংস্কৃতি কেন্দ্রেও থাকতে পারেন।

তথ্য সূত্র: পুরুলিয়া তরুণ দেব ভট্টাচার্য, ও  স্যার সুভাষ রায় মহাশয়।

Leave a Reply